টি‌সি‌বির প‌ণ্যের জন্য ‘মুখ ঢাকা’ মধ্য‌বিত্তের দীর্ঘ লাইন

Slider জাতীয়

প্রতিনিয়তই বাড়ছে ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, চিনি,চাল, মাছ, মুরগি ও মাংসের দাম। একটা জিনিস কিনতে গেলে দুটো জিনিস কিনতে পারছি না। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে লম্বা হচ্ছে টিসিবির লাইন। মধ্যবিত্তরা এখন সংসারের খরচ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। টিসিবির লাইনে দাঁড়ানো ছাড়া উপায় নেই তাদেরও। তাই সাত-পাঁচ না ভেবে নিম্নবিত্তদের সঙ্গে দাঁড়াচ্ছেন মধ্যবিত্তরাও। অনেকে আবার মুখ ঢেকে, কেউ মাস্ক পরে পণ্য কিনতে এসেছে।

মঙ্গলবার (১৫ মার্চ) সরেজমিন রাজধানীর কয়েকটি এলাকা ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল ১০টার দিকে রাজধানীর হাতিরপুল কাঁচাবাজারের সামনে ভিড় করেছেন প্রায় দুইশ মানুষ। নিজ উদ্যোগে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করেন তারা। এক ঘণ্টা পর ট্রাক আসতেই মানুষের সংখ্যা বেড়ে যায়, প্রায় ডাবল। আশেপাশে অপেক্ষারত মধ্যবিত্ত তারা। বিক্রি কার্যক্রম শুরুর একঘণ্টা হতে না হতে চারটি পণ্যের মধ্যে তেল প্রায় শেষের পথে। আরও কিছু সময় পর শুরু হয় ধস্তাধস্তি। কার আগে কে পণ্য নেবে, এ নিয়ে তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। টাকাসহ হাত বাড়ায় টিসিবির বিক্রয়কর্মীর দিকে। দীর্ঘ সময় লাইনে থাকায় গরমে, ঘামে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। দুই ঘণ্টার মধ্যে তেল এবং পেঁয়াজ শেষ হয়ে গেলে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষরা দিশেহারা হয়ে পড়েন।

চিনি এবং মসুর ডাল তখনও রয়ে গেছে ট্রাকে কিন্তু তেল, পেঁয়াজ না পেয়ে হালিমা বেগম (ছদ্মনাম) আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাজারে তেল আর পেঁয়াজের অনেক দাম। সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলাম। অনেক মানুষের ভিড়ে ট্রাকের কাছে যেতে পারিনি। এখন শুনছি, তেল ও পেঁয়াজ শেষ।’

ভুতের গলিতে বসবাসকারী ফিরোজা বেগম (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আমার স্বামী তিন দিন থেকে অসুস্থ। তাকে বাসায় রেখে এসেছি। তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। ২৮ হাজার টাকা বেতন পান। বড় মেয়ে কলেজে পড়ে। আর ছেলেটা স্কুলে। প্রায় সবকিছুর দাম বাড়ায় সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে। এ কষ্টটা বেড়েছে গত কয়েক মাস ধরে। কোনো রকমে খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে। আজ বাধ্য হয়ে এখানে কম দামে পণ্য কিনতে এসেছিলাম। কিন্তু পেলাম না। আর সংসার চালাতে পারছি না। গাড়িতে পণ্য বেশি থাকলে হয়তো কিনতে পারতাম।’

টিসিবির ট্রাকে পর্যাপ্ত মালামাল না থাকা প্রসঙ্গে টিসিবির মুখপাত্র হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এলাকা অনুযায়ী প্রতিটি ট্রাকে ৫০০ থেকে এক হাজার কেজি চিনি, সমপরিমাণ মসুর ডাল, পেঁয়াজ এবং সর্বোচ্চ এক হাজার লিটার সয়াবিন তেল বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ইদানীং অনেক মধ্যবিত্তরা লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। যে কারণে লাইন দীর্ঘ হচ্ছে। ফলে দ্রুত ট্রাকের পণ্য বিক্রি শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেকে পণ্য পাচ্ছেন না। এবার রেকর্ড পরিমাণ পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে। আমরা তিন-চার মাস আগে থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছি। পাশাপাশি কালোবাজারে যাতে এসব পণ্য বিক্রি না হতে পারে সেজন্য ব্যাপক মনিটরিং করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’

শ্যামলী সিনেমা হলের একটু আগে, প্রধান সড়কে টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কিনতে আসা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মামুনুর রহমান বলেন, ‘বাজারের তুলনায় অনেক কম দামে পণ্য কিনতে পেরেছি, সেজন্য ভালো লাগছে। অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে শেষ পর্যন্ত পণ্য কিনতে পারলাম। তবে কিছু বিশৃঙ্খলাও রয়েছে। ট্রাকের বিক্রয়কর্মীরা লাইনে দাঁড়ানো মানুষদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। মানুষের তুলনায় পণ্য অনেক কম রাখে। সেজন্য লাইনের অনেকেই পণ্য পায় না। আরও বেশি করে পণ্য আনলে এই দুর্দিনে সবার উপকার হতো।’

টিসিবি সূত্র জানিয়েছে, বাজারে পণ্যের দাম বাড়তি থাকায়, সরকারি নির্দেশনায় আসন্ন রমজানে এক কোটি নিম্ন আয়ের পরিবারকে ভর্তুকিমূল্যে পণ্য দেওয়ার কার্যক্রম পরিচালনা করবে টিসিবি। বর্তমানে রাজধানীর উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন ১৫০টি ট্রাকে করে পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।

এই বিক্রি কার্যক্রম ২৪ মার্চ পর্যন্ত চলবে। দুই দিন বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় পর্যায়ে ২৭ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত পণ্য বিক্রি করা হবে। তবে রাজধানী বাদে অন্যান্য জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৫ মার্চ থেকে বিক্রি শুরু হবে।

বর্তমানে টিসিবির ট্রাক থেকে একজন ক্রেতা প্রতি কেজি চিনি ৫৫ টাকা করে সর্বোচ্চ ২ কেজি, মসুর ডাল ৬৫ টাকা করে সর্বোচ্চ ২ কেজি, ১১০ টাকা লিটার ধরে সর্বোচ্চ ২ লিটার সয়াবিন তেল, আর ৩০ টাকা কেজি দরে একজন ক্রেতা ২ থেকে সর্বোচ্চ ৫ কেজি করে পেঁয়াজ কিনতে পারছেন।