ভাইয়ের বিয়ে ছেড়ে ইউক্রেনে গিয়েছিল ভারতীয় নারী পাইলট

Slider right সারাবাংলা

ভাইয়ের বিয়ের প্রস্তুতি তুঙ্গে। তখনই ফোনটা এসেছিল তার কাছে। অপর প্রান্ত থেকে প্রশ্ন, ‘ইউক্রেনে আটকে পড়া ভারতীয় শিক্ষার্থীদের উদ্ধারকাজে যেতে ইচ্ছুক?’-‘হ্যাঁ!’ কালবিলম্ব না করে রাজি হয়ে গিয়েছিল এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানচালক ক্যাপ্টেন শিবানী কালরা। সম্প্রতি যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে কয়েক হাজার ভারতীয় পড়ুয়া আটকে পড়ার পর তাঁদের উদ্ধারকাজ শুর করেছিল ভারত সরকার। অপারেশন গঙ্গা নামে এই মিশনে ইউক্রেনের পার্শ্ববর্তী দেশ রোমানিয়া এবং পোল্যান্ড থেকে ভারতীয়দের বিমানে দেশে ফিরিয়ে এনেছে ভারত আর এই মিশনেই বাঙালি বিমানচালক মহাশ্বেতা চক্রবর্তীর কথা প্রকাশ্যে এসেছিল।

মহাশ্বেতা একটি বেসরকারি সংস্থার বিমানচালক (ফার্স্ট অফিসার)। ২৭ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলা ফোন পেয়ে যিনি শামিল হন ‘অপারেশন গঙ্গা’য়। বাড়ি ছাড়ার আগে বলতেও পারেননি মা-বাবাকে। টানা ১৫-১৬ ঘণ্টা ককপিটে কাটাতে হয়েছিল শুধু কফি-বিস্কুট খেয়ে। মহাশ্বেতার সঙ্গে শিবানীর দূরত্ব হল, দ্বিতীয় জন ক্যাপ্টেন। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের ‘অপারেশন গঙ্গা’-র অঙ্গ হিসাবে চলতি মাসের গোড়ায় ইউক্রেনের ভারতীয় শিক্ষার্থীদের উদ্ধারকাজে নেমেছিলেন শিবানী। তাদের মধ্যে আড়াইশোর বেশি শিক্ষার্থীকে দিল্লিতে নিয়ে আসতে পেরেছেন তিনি।

যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনে আটকে পড়া ভারতীয়দের ফেরাতে এর আগে পাঁচ বার সে দেশে গিয়েছে উদ্ধারকারী দল। তবে শিবানীর জীবনে এমন অভিজ্ঞতা এই প্রথম! ভারতীয় গণমাধ্যমে শিবানী বলেন, ‘উদ্ধারকাজে যাওয়ার জন্য রাতে বাড়ি ছাড়ার আগে আমাকে হঠাৎই জড়িয়ে ধরল মা। সাধারণত এমনটা করে না। তবে সে সময় মা একটু আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিল।’ উদ্ধারকাজে আগেও গিয়েছেন শিবানী। কোভিডকালে বিদেশে আটকে পড়া ভারতীয়দের দেশে ফিরিয়েছেন। তবে যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে উদ্ধার করার সুযোগ আগে কখনও আসেনি।

শিবানীর কথায়, ‘যুদ্ধের খবর শুনে মা খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। বাবা আর ভাইয়ের উদ্বেগও বাড়ছিল। ওখানে (ইউক্রেনে) পৌঁছনো মাত্র আমাকে ফোন করেছিল ওরা।’ ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাশিয়ার আক্রমণের পর ইউক্রেন ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে শুরু করেন বহু নাগরিক এবং বিদেশি বাসিন্দা। তাদের মধ্যে ছিলেন ভারতীয় শিক্ষার্থীরাও। ২৮ ফেব্রুয়ারি কোনো রকমে ইউক্রেনের সীমান্ত পৌঁছেছিলেন তারা। তার পর সীমান্ত পার করে রোমানিয়া এবং হাঙ্গেরিতে আশ্রয় নেন।

উদ্ধারকারী দলের হয়ে ইউক্রেন থেকে শিবানীরা পৌঁছন রোমানিয়ার বুদাপেস্ট। সে অভিজ্ঞতার কথা ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করেছেন তিনি। এয়ার ইন্ডিয়ার ককপিটে বসা শিবানীর ছবি দেখে তাকে বাহবা দিচ্ছেন নেটমাধ্যমে অনেকে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে দেশে ফেরার পর সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে উঠে এসেছেন শিবানী। তিনি বলেন, ‘বুদাপেস্টে উদ্ধারকারী দলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন ভারতীয় শিক্ষার্থীরা। আমাদের দেখে তাদের সকলের ভয়ার্ত মুখে হাসি ফুটে উঠেছিল। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলাপের পর বুঝলাম, সকলেই ভয়ে সিঁটিয়ে রয়েছেন।’

শিবানী বলে চলেন, ‘কথাবার্তা বলে তাদের সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করছিলাম। আশ্বস্ত করেছিলাম, সকলকেই নিরাপদে দেশে ফিরবেন!’
প্রতিশ্রুতি রেখেছিলেন শিবানী। সে দিন বুদাপেস্ট থেকে ২৪৯ জন ভারতীয় শিক্ষার্থীদের দিল্লিতে নিয়ে এসেছিলেন তিনি। শিবানী বলেন, ‘বিমানে বসার পর ভয় সিঁটিয়ে থাকলেও দেশে ফেরার উত্তেজনায় ফুটছিলেন শিক্ষা। আমার পরিবারও কম চিন্তিত ছিল না। তবে সব কিছুই ঠিকঠাক মিটে গিয়েছে।’

বুদাপেস্ট থেকে দিল্লিতে অবতরণ করেছিল শিবানীদের বিমান। তার আগে উদ্ধারকাজের দ্বিতীয় পর্বে আবারও বিমান নিয়ে উড়ে গিয়েছিলেন শিবানীরা। এ বার হাঙ্গেরির বুখারেস্টে। সেখান থেকেও শিক্ষার্থীদের উদ্ধার করেন তারা। দেশে ফেরার পর অভিনব ভাবে স্বাগত জানানো হয় উদ্ধারকারী দলকে। শিবানীর কথায়, ‘দিল্লি বিমানবন্দরে অবতরণের পর সকলেই হাততালি দিচ্ছিলেন। গেট দিয়ে বেরোতেই বাড়ির লোকজনের হাসিমুখ দেখেছিলাম।’

এয়ার ইন্ডিয়ায় তিন বছর ধরে কাজ করছেন শিবানী। তবে এ রকমের সুযোগ কখনও হয়নি। শিবানী বলেন, ‘এই প্রথম এ ধরনের অভিজ্ঞতার সাক্ষী হলাম। এই সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ।’ শিক্ষার্থীদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে পেরে তৃপ্ত শিবানী। তিনি বলেন, ‘বিমানবন্দরে সকলেই আমাদের জন্য গলা ফাটাচ্ছিলেন। আমি অভিভূত। বেশ গর্বও হচ্ছিল। ওই শোরগোলের মাঝে সবচেয়ে জোরে চেঁচাচ্ছিল আমার মা-বাবা। বলেছিল, ‘সাবাশ!’