ইউক্রেন সেনাদের পোশাকের কালো সূর্যের ছবি কি নাৎসি প্রতীক

সারাবিশ্ব

সম্প্রতি ইউক্রেনের সেনাদের ইউনিফর্মের দু’টি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। কারণ, তাতে নাৎসিবাদের সাথে সম্পর্কিত একটি প্রতীক আঁকা থাকতে দেখা যাচ্ছে। প্রথম ছবিতে কিয়েভ থেকে বেসামরিক নাগরিকদের সরিয়ে নেয়ার কাজ করছিলেন- এমন একজন সেনার বুকে পড়া গিয়ার মানে সুরক্ষা-বর্মের ওপর কালো-সূর্য প্রতীক দেখা যাচ্ছে।

ছবিটি তুলেছিলেন ইউক্রেনের ফটোসাংবাদিক আনাস্তাসিয়া ভ্লাসোভা এবং গেটি ইমেজ সেটি টুইটারে পোষ্ট করেছিল।

দ্বিতীয় ছবিটি ৮ই মার্চে ন্যাটো পোষ্ট করে এবং পরে ডিলিট করে দেয়।

ওই ছবিটিতে একজন নারী সেনার ইউনিফর্মের ওপরও একই কালো সূর্য প্রতীক দেখা যায়।

ন্যাটোর এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবসের অংশ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের জন্য নারীদের একটি কোলাজ বানানো হয়েছিল। আমরা একটি আন্তর্জাতিক এজেন্সির সংগ্রহ থেকে ওই ছবিটি ব্যবহার করেছিলাম। কিন্তু যখন আমরা বুঝতে পারলাম ওটাতে এমন একটি প্রতীক রয়েছে যেটি আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করতে পারছি না, তখন ছবিটি সরিয়ে নেয়া হয়।’

কালো সূর্য প্রতীকের মানে কী? এ প্রতীকটি দুটি এককেন্দ্রিক বৃত্ত দিয়ে গঠিত, যার মধ্য দিয়ে সূর্যরশ্মি প্রবাহিত হচ্ছে।

এ প্রতীকের ভিন্ন ভিন্ন রূপ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি- যেমন নর্ডিক এবং কেল্টিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যবহার হয়।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে কাজ করে- এমন সংস্থা অ্যান্টি-ডিফেমেশন লিগ এডিএল বলছে, ‘এ চিহ্নের অর্থ ‘বর্ণবাদ বা শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদ’-ই হবে, আমাদের সেটা ধারণা করে নেয়া উচিত হবে না।’

সংস্থাটি বলছে, ‘কিন্তু তা সত্ত্বেও, কালো সূর্য নাৎসিদের ব্যবহার করা কয়েকটি ইউরোপীয় প্রতীকের একটি, যার মাধ্যমে একটি আদর্শ আর্য জাতি তৈরি করতে চেয়েছিল তারা।’

নাৎসিবাদের সাথে সবচেয়ে বেশি সম্পর্কিত প্রতীক হচ্ছে স্বস্তিকা চিহ্ন, যা ইউক্রেনের সেনাদের ইউনিফর্মে দেখা যায়নি।

কিন্তু মানবাধিকার সংস্থা ফ্রিডম হাউজ বলছে, ইউক্রেনে কালো সূর্য প্রতীক প্রায়ই উগ্র-ডানপন্থী আদর্শের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার হয়।

উদাহরণস্বরূপ, এটি আজভ ব্যাটালিয়নের চিহ্নের অংশ, যে জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীটি রুশ সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর সাথে ইউক্রেনের সংঘাতের সময় আলোচনায় উঠে আসে।

এটি মূলত একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন হিসেবে গঠিত হয়েছিল। পরে দেশটির সেনাবাহিনীর সাথে একে একীভূত করা হয়।

ন্যাশনাল গার্ড কমান্ডারদের নির্দেশনায় এটি পরিচালিত হয় এখন।

ভোটের হিসাবে যদিও ডানপন্থী দলগুলো খুবই ক্ষুদ্র একটি অংশ। ২০১৯ সালের নির্বাচনে প্রার্থী ও ডানপন্থী ছোট দলগুলো পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য নূণ্যতম পাঁচ শতাংশ ভোট পেতে হয়, তাও পায়নি।

ডিনাজিফাই শব্দের মাধ্যমে মূলত নাৎসিবাদ এবং এর প্রভাব থেকে মুক্তিকে বোঝানো হয়।

দুই সেনার পোশাকের কালো সূর্য প্রতীকের কারণে ইউক্রেনের রাজনীতিতে ডানপন্থী আদর্শের প্রভাব বাড়ছে কি না নতুন করে সে বিতর্ক উস্কে দিয়েছে।

দীর্ঘদিন যাবত যে অজুহাতে ইউক্রেনে হামলা চালাতে চাইছিলেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুতিন যখন ইউক্রেনের ‘ডিনাজিফিকেশনের’ কথা বলেছিলেন, যার মাধ্যমে তিনি মূলত বিশ্ব এবং বিশেষ করে রাশিয়ার জনগণের কাছে আরেকটি স্লাভিক জাতির বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়টিকে যৌক্তিকতা দিতে চেষ্টা করছিলেন।

ইউক্রেন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কেইর জাইলস, যিনি ন্যাটোর জন্য তথ্যযুদ্ধ নিয়ে রিপোর্ট লিখেছেন, তিনি বলছেন, ইউরোপে কোন প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করতে হলে রাশিয়া সহজেই তাকে নাৎসি তকমা দিয়ে দেয়।

তিসি বলেন, ‘আর তা কেবল ইউক্রেন নয়, বাল্টিক অন্য রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রেও রাশিয়া এ শব্দ ব্যবহার করে।’

ব্রাজিলের ইউনিকুরিটিবা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু ট্রমান বলছেন, ‘ইউক্রেন নাৎসি ভাবধারায় চলছে সেটা নিশ্চয়ই আপনি বিশ্বাস করবেন না, পুতিন যেমনটি বলছেন।’ তিনি বলেন, ‘কিন্তু দেশটিতে নব্য-নাৎসিদের সংখ্যা যে নগণ্য ব্যাপারটা তাও নয়।’

কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার সান্টা ক্লারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ অ্যামি র‌্যানডাল বিবিসিকে বলেন, ইউক্রেন নাৎসি বা ফ্যাসিবাদীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত দেশ নয়।

তিনি স্বীকার করছেন যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটিতে উগ্র-জাতীয়তাবাদী এবং ফ্যাসিস্টদের উত্থান ঘটেছে, কিন্তু ‘সেটা তো সারা দুনিয়াতেই হয়েছে, ইউক্রেনের একার সমস্যা নয়।’

তিনি বলেন, ‘বস্তুত, ইউক্রেনে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার আছে, যার প্রধান একজন ইহুদি। ভলোদিমির জেলেনস্কির বাবার মামা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা হলোকাস্টের সময় নিহত হয়েছিলেন।’

অতি-ডানপন্থী দলগুলো জার্মানি এবং ফ্রান্সের সাধারণ নির্বাচনে ইউক্রেনের দলগুলোর চাইতে অনেক বেশি সমর্থন পেয়েছে। সূত্র: বিবিসি।