রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দক্ষিণ এশিয়া

Slider সারাবিশ্ব

ব্যাহত হয়েছে বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন। জ্বালানি পণ্যের ক্রমবর্ধমান বাজারদর দেশে দেশে জোরালো করে তুলেছে মূল্যস্ফীতিকে। এ মূল্যস্ফীতির হার আবার ছাপিয়ে যাচ্ছে প্রবৃদ্ধির হারকে। মহামারীকালে দেয়া প্রণোদনাগুলো আর চালু রাখতে পারছে না বিশ্বের অগ্রসর অর্থনীতির দেশগুলো। কোয়ান্টিটেটিভ ইজিংয়ের (মুদ্রাপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে সচল রাখার প্রয়াস) পথ থেকে বেরিয়ে এসেছে অনেক দেশ। বিপরীতে বাড়ছে সুদহার। বিভিন্ন দেশের জাতীয় মুদ্রানীতিতে পাওয়া যাচ্ছে প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত। অস্থিতিশীল বৈশ্বিক পুঁজি ও পণ্যবাজার। ঠিক এমনই এক মুহূর্তে পরিস্থিতিকে আরো সঙ্গিন করে তুলেছে ইউক্রেন যুদ্ধের সূত্রপাত। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় এ যুদ্ধের অর্থনৈতিক অভিঘাত মারাত্মক হয়ে দেখা দেবে বলে আশঙ্কা বৈশ্বিক অর্থনীতির পর্যবেক্ষকদের।

২০০৮-০৯ সালের মহাসংকোচনের পর বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় দুর্দিনের অশনিসংকেত নিয়ে এসেছিল কভিডের প্রাদুর্ভাব। এ অভিঘাত পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠেনি বিশ্ব। বরং জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ চেইনের বিধ্বস্ত দশা ও ক্রমবর্ধমান বাজারদরের কারণে পরিস্থিতি আবারো খারাপের দিকে যাওয়ার আশঙ্কা করছিলেন পর্যবেক্ষকরা। এর মধ্যেই শুরু হয়েছে ইউক্রেন যুদ্ধ।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর স্থানীয় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এ মুহূর্তে অঞ্চলটিতে যুদ্ধের সবচেয়ে নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে বাণিজ্য খাতে। এ অঞ্চলের দেশগুলোর এমনিতেই আমদানিনির্ভরতা বেশি। যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই এখানকার দেশগুলোয় বিশ্বের অন্যান্য স্থানের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার তুলনামূলক বেশি ছিল। পরিস্থিতিকে আরো খারাপ তুলছে বৈশ্বিক পণ্যবাজারে যুদ্ধসৃষ্ট ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা। কাঁচামালের বাড়তি দামে বাড়ছে এ অঞ্চলের উৎপাদন খরচ। শ্রমঘন শিল্পগুলোর জন্য সস্তা শ্রমের সুবিধা অনেকটাই অকেজো করে দিচ্ছে এ অতিরিক্ত খরচ। মারাত্মক চাপে পড়ছে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতও। বিশ্বের অন্যান্য এলাকার তুলনায় দক্ষিণ এশিয়ায় জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা অনেক বেশি। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এসব জ্বালানির বাজার এখন পুরোপুরি লাগামহীন। বিদ্যুৎ উৎপাদনে খরচ বাড়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত জ্বালানির সংস্থান করাটাই এখন দেশগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এছাড়া অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তার কারণে বৈশ্বিক আর্থিক বাজার থেকে বিনিয়োগ সরিয়ে নিচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। ঝুঁকছেন তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের দিকে। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতেও এর পরোক্ষ প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা প্রবল।

সেন্ট্রাল ব্যাংক অব শ্রীলংকার সাবেক ডেপুটি গভর্নর নন্দলাল বিরাসিংহে ও ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের ইনস্টিটিউট অব সাউথ এশিয়ান স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো গানেশান উইগনারাজার মতে, দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাব দেখা যাবে মূল্যস্ফীতি আরো জোরালো হয়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। অন্যদিকে পরোক্ষ প্রভাব দেখা যাবে স্থবিরতা এবং এর ধারাবাহিকতায় স্ট্যাগফ্লেশনের (উচ্চমূল্যস্ফীতির বিপরীতে মন্দা ও উচ্চমাত্রার কর্মহীনতা) মধ্য দিয়ে। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে ক্ষতির মাত্রা কতটা হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে সংঘাতের স্থায়িত্ব, রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা বিধিনিষেধের মাত্রা এবং মস্কোর নীতিগত প্রতিক্রিয়ার ওপর। এছাড়া দেশভেদে এ ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করছে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশটির অর্থনৈতিক যোগাযোগের ওপর। এক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি এবং এসব অঞ্চলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশের যোগাযোগের মাত্রার ওপরও ক্ষতির বিষয়টি অনেকটা নির্ভর করবে।

রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা বিধিনিষেধ আরো জোরালো হলে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও পণ্যবাজারের মূল্য পরিস্থিতিও আরো খারাপের দিকে যাবে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তাদের ভাষ্যমতে, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির ওপর যুদ্ধের বিরূপ প্রভাব পড়ার অর্থ হলো গন্তব্য দেশগুলোয় দক্ষিণ এশিয়ার রফতানি পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া। মহামারীর কারণে এ অঞ্চলে আগে থেকেই বিরাজ করছিল মূল্যস্ফীতি। একই সঙ্গে বেড়েছে বৈষম্য। দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়েছে অর্থনৈতিকভাবে নাজুক অবস্থানে থাকা মানুষ। যুদ্ধের কারণে এ অঞ্চলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গিয়ে প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়তে যাচ্ছে আয়বৈষম্যও। এর ধারাবাহিকতায় দরিদ্রতা বেড়ে যাওয়ারও বড় ধরনের আশঙ্কা রয়েছে। সংঘাত দীর্ঘতর হলে দক্ষিণ এশিয়ার ওপর এর প্রভাব হবে আরো মারাত্মক।

পর্যবেক্ষকদের মতে, পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপের দিকে যাওয়ার অর্থ হলো গোটা ইউরোপ পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। এক্ষেত্রে তা আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার হলে। এ অবস্থায় দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিতে এর প্রভাব হবে কভিডের চেয়েও সুদূরপ্রসারী। তিন বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো মন্দায় পড়বে বৈশ্বিক অর্থনীতি, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই যার প্রভাব হবে বিভিন্নমুখী। বৃহদায়তনের অভ্যন্তরীণ বাজারের কারণে এমন পরিস্থিতিতে কিছু সময়ের জন্য একেবারেই স্বল্পমাত্রার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে সক্ষম হতে পারে ভারত। মারাত্মক পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হতে পারে প্রবৃদ্ধির জন্য রফতানি ও রেমিট্যান্সের ওপর বড় মাত্রায় নির্ভরশীল বাংলাদেশকেও। তবে ভুটান, নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলংকার মতো তুলনামূলক ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এর প্রভাব হবে অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী। দেশগুলোয় মন্দার মাত্রা ও প্রভাব ভারত বা বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী ও নেতিবাচক হয়ে দেখা দিতে পারে। নাজুক অবস্থায় থাকা পাকিস্তানের অর্থনীতিও একই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে পারে। শ্রীলংকা ও মালদ্বীপের মতো ছোট অর্থনীতির দেশগুলোর পর্যটন ও বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে বড় পরিসরে। রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশের সঙ্গেই এসব দেশের পর্যটন ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ অনেক গভীর। শ্রীলংকার মোট চা রফতানির ২০ শতাংশই যায় রাশিয়ায়।

(ইস্ট এশিয়া ফোরামে প্রকাশিত নিবন্ধ অবলম্বনে)