ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধের পরিণতি কী?

Slider সারাবিশ্ব

গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলার ঘোষণা দেয়ার মাধ্যমে যখন ভ্লাদিমির পুতিন ইউরোপের শান্তি ছিন্নভিন্ন করে দিলেন, তখন সে দাবি করে ছিলো যে, আধুনিক ও পশ্চিম-ঘনিষ্ঠ ইউক্রেন রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য হুমকি তাই এই সেনা অপারেশন চালাচ্ছেন। তবে চার সপ্তাহ ধরে চলা এ হামলায় বোমাবর্ষণ, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু আর হিসাব ছাড়া মানুষের ঘরবাড়ি হারিয়ে শরণার্থী হওয়ার পর প্রশ্ন রয়ে গেছে, আসলে রাশিয়া এ হামলার উদ্দেশ্য কী?

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেনে হামলা চালানোর আগে হয়তো ভেবেছিলেন যে, তিনি খুব সহজেই এ হামলার মাধ্যমে যুদ্ধে জয় পাবেন, তবে তা হয়নি। এমনকি প্রথমে এ রুশ সেনা অগ্রাসনকে তিনি হামলা বা যুদ্ধ বলেও মানতে রাজি হননি, তখন তিনি-এর নাম দিয়েছিলেন ‘স্পেশাল মিলিটারি অপারেশন’ বা বিশেষ সামরিক অভিযান।

তখন রাশিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা দপ্তরের প্রধান সের্গেই নারাস্কিন বলেছিলেন, রাশিয়ার ভবিষ্যৎ এবং বিশ্বে রাশিয়ার অবস্থান এখন ঝুঁকিতে পড়েছে। তাই এ নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এ হামলা করা জরুরী।

সেসময় ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার জনগণের উদ্দেশ্যে দেয়া তার বক্তব্যে বলেছিলেন, ইউক্রেনে তার হামলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, ইউক্রেনের নিরস্ত্রীকরণ এবং নাৎসি মুক্ত করা। তিনি দাবি করেন, এ অগ্রাসনের মাধ্যমে আট বছর ধরে চলমান ইউক্রেনের সরকারের নির্যাতন ও গণহত্যা থেকে মানুষজনকে মুক্ত করা হচ্ছে।

এসময় তিনি জোর দিয়ে বলেছিলেন, ইউক্রেন দখল করে রাখা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা গায়ের জোরে কোন কিছু বা কাউকে অপসারণ করতে চাই না।

তবে ইউক্রেনে কোন নাৎসি নেই বা গণহত্যার কোন ঘটনাও ঘটেনি। বরং ইউক্রেনের শত শত নগর ও শহরের ওপর নিষ্ঠুরভাবে শক্তি প্রয়োগ করছে রাশিয়া। আর রুশ সেনাদের এই অগ্রাসন ইউক্রেনের জনগণ ও সেনারা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করছে।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ইউক্রেন স্বাধীনতা পায়। এরপর থেকে দেশটি ধীরে ধীরে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। আর এ বিষয়টিই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পরিবর্তন চান।

২৪ ফেব্রুয়ারি দেয়া ভাষণে পুতিনের দাবি করেন, রাশিয়া আর ইউক্রেনের মানুষ ‘এক জাতি’। সেসময় তিনি ইউক্রেনের ইতিহাস অস্বীকার করে জোর দিয়ে বলেছেন, ইউক্রেন কখনোই প্রকৃত রাষ্ট্র ছিলো না।

এর আগে ২০১৩ সালে রাশিয়া পন্থী ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের ওপর পুতিন চাপ তৈরি করেছিলেন যেন তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর না করেন। সেই ঘটনার জের ধরে প্রতিবাদ বিক্ষোভ শুরু হলে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন।

সেই বছরই ইউক্রেনের দক্ষিণের এলাকা ক্রাইমিয়াকে সংযুক্ত করে পাল্টা জবাব দেয় রাশিয়া। সেই সঙ্গে পূর্বাঞ্চলের দুটি এলাকায় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিদ্রোহে সমর্থন দেয়। সেই থেকে ইউক্রেনের বাহিনীর সঙ্গে আট বছর ধরে লড়াই চলছে। তবে এ নিয়ে একটি যুদ্ধবিরতি হয়েছিলো। ২০১৫ সালে মিনস্ক শান্তি চুক্তি, কিন্তু তা কখনোই কার্যকর হয়নি।

ইউক্রেনে রুশ সৈন্য পাঠানোর সময় পুতিন নেটোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন বলেন, জাতি হিসাবে আমাদের ঐতিহাসিক ভবিষ্যতকে হুমকিতে ফেলেছে। কোনরকম তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই তিনি দাবী করেন, নেটো দেশগুলো ক্রাইমিয়ায় যুদ্ধ ডেকে আনতে চায়। এছাড়া ইউক্রেনে হামলার আগে বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত দুটি এলাকাকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে ওই শান্তি চুক্তি ছিঁড়ে ফেলেন প্রেসিডেন্ট পুতিন।

অন্যদিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের একজন পরামর্শক মিখাইলো পোডোলায়াক বিশ্বাস করেন, আগামী কয়েকদিন মধ্যেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। কারণ রাশিয়ার সৈন্যরা তাদের বর্তমান অবস্থানে আটকে গেছে।

যুদ্ধ বিরতির বিষয়ে পোডায়ালাক বলেছেন, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তার দাবিদাওয়ার বিষয়ে নমনীয় হয়েছেন।

যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়ার নেতা চেয়েছিলেন যেন ক্রাইমিয়াকে রাশিয়ার অংশ হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হয় এবং বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত দুটি এলাকার স্বাধীনতাকে মেনে নেয়া হয়। সংবিধান সংশোধন করে ইউক্রেনকে এই নিশ্চয়তা দিতে হবে যে, তারা কখনো নেটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেবে না।

তবে রাশিয়া সমর্থিত বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত লুহানস্ক এবং দোনেৎস্ক-এর ভবিষ্যৎ কি হবে, তা নিয়ে এখনো কোন সমঝোতা হয়নি। কিন্তু দুই পক্ষ যদি বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করতে চায়, তা নিয়ে কোন সমস্যা হবে না। সূত্র: বিবিসি