পুরান ঢাকার প্লাস্টিক-কেমিক্যাল গোডাউনগুলো যেন মৃত্যুপুরী

Slider জাতীয়

নানা অনিয়ম-অব্যবস্থাপনার মধ্যেই মৃত্যুঝুঁকি নিয়েই বসবাস পুরান ঢাকার মানুষের। একেকটি আগুন ট্র্যাজেডি কেড়ে নেয় মানুষের জানমাল সর্বস্ব। কিছুদিন পরপর কেমিক্যাল ও প্লাস্টিক কারখানায় লাগা আগুনে মৃত্যু হচ্ছে সাধারণ মানুষের। বাড়িতে বাড়িতে প্লাস্টিক, কেমিক্যাল গোডাউনগুলো যেন একেকটি মৃত্যুপুরী।

নিমতলী থেকে চকবাজারের চুড়িহাট্টা, আরমানিটোলা। এ ছাড়াও প্রতিনিয়ত পুরান ঢাকার প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল গোডাউনে ঘটছে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা।

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও বিভিন্ন সংস্থার হিসাব মতে, দুই দশকে বাংলাদেশে শিল্পকারখানায় ২৬টির বেশি দুর্ঘটনায় দুই হাজারের মতো শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আর গত ১১ বছরে শুধু পুরান ঢাকায় পৃথক ঘটনায় অন্তত দুই শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। হতাহতের দিক থেকে সবচেয়ে ভয়াবহ ১৫টি অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে মাত্র ৩টি ঘটনার পর মামলা হয়েছে। এসব দুর্ঘটনা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের জান-মালের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও দোষীদের চিহ্নিত করা গেলেও তারা সব সময়ই ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে যায়।

সূত্র বলছে, পুরান ঢাকার গুদামগুলোতে বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য যেমন ড্রামভর্তি করে মজুদ করা হয় তেমনই অনেক গুদামে মজুদ থাকে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক, জুতার সোল তৈরির এডহেসিভ ও পেস্টিং সলিউশন- যার সবই দাহ্য পদার্থ। সার উৎপাদনেও আবার এই রাসায়নিক পদার্থটির ব্যবহার রয়েছে। তবে সার কারখানাগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকলেও অধিকাংশ অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট মজুদ করে রাখা হয় কেবল পুরান ঢাকার বিভিন্ন গুদামে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, রাসায়নিকের এক একটি ড্রাম এক হাজার বোমার চেয়েও বেশি শক্তিশালী, যা থেকে আগুনের সূত্রপাত হলে পুরান ঢাকার অধিকাংশ জায়গাই পুড়ে যেতে পারে। কারণ, এসব গুদামের কোনোটাতেই অগ্নিকাণ্ড অগ্নিনির্বাপকের তেমন ব্যবস্থা নেই।

সর্বশেষ শুক্রবার (১৫ এপ্রিল) দুপুরে পুরান ঢাকার লালবাগে একটি প্লাস্টিক কারখানায় আগুন লাগে। প্রশ্ন উঠেছে, বার বার কেন এতো দুর্ঘটনা?কেন এত প্রাণহানি? এই দ্বায় কার? বারবার অগ্নিকাণ্ড হলেও পুরান ঢাকার বেশিরভাগ বাড়ির মালিক অধিক ভাড়ার লোভে বাসার নিচতলায় রাসায়নিক পদার্থ মজুদের জন্য ভাড়া দেন। এই কারখানা ও গুদামগুলোর বেশির ভাগেরই নেই পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন, বিস্ফোরক অধিদপ্তর কিংবা ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র। পুরান ঢাকা থেকে এসব প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল কারখানা সরিয়ে কামরাঙ্গীচর ও কেরানীগঞ্জে নেয়ার কথা থাকলেও আজও এর হয়নি সুরাহা।

শুক্রবারের প্লাস্টিক কারখানায় আগুনের বিষয়ে জানতে চাইলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, কারখানায় প্রচুর পরিমাণে প্লাস্টিক থাকায় আগুন নেভাতে বেগ পেতে হয়েছে। কারখানার ভেতরের মালামাল পুড়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে আগুন লাগার কারণ ও ক্ষতির সঠিক পরিমাণ জানা যায়নি। হতাহতের কোনো খবরও আসেনি। তদন্তের পর জানানো হবে।

এর আগে গত ১৮ মার্চ পুরান ঢাকার বংশালের নিমতলী এলাকায় প্লাস্টিকের পাইপের কারখানায় আগুন লাগে। আগুনে নিহতের ঘটনা না থাকলেও কারখানার অনেক ক্ষয় ক্ষতি হয় বলে জানায় ফায়ান সার্ভিস।

গত ২৪ মার্চ পুরান ঢাকার মৌলভীবাজারে তাজমহল টাওয়ারের পাশে একটি ছয়তলা ভবনের চতুর্থ তলায় আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিস জানায়, ওই ভবনে বেশ কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ছিলো। গত ১২ ফেব্রয়ারি পুরান ঢাকার মাহুতটুলীর ৪ তলা ভবনের নিচতলায় পলিথিনের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

প্রতিনিয়ত আগুন লাগার বিষয়ে স্থানীয়দের পাশাপাশি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কিছু ব্যবসায়ী ও অতি মুনাফালোভী ভবন মালিকদের লোভের খেসারত দিচ্ছে পুরান ঢাকার মানুষ। তাই সরকারকে কঠোরভাবে সুপারিশ বাস্তবায়ন করে পুরান ঢাকার সব কেমিক্যাল কারখানা নির্ধারিত জায়গায় স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন ঠিকানায় ব্যবসার অনুমতি নিয়ে অনেকেই পুরান ঢাকার ভেতরেই রাসায়নিকের মজুদ ও ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এসব কাজকে নির্বিঘ্ন করতে তারা স্থানীয় প্রভাবের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবকেও কাজে লাগাচ্ছেন। তাছাড়া, এই এলাকার রাসায়নিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত যেমন কার্যকর হচ্ছে না তেমনই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও তাদের সমীহ করে চলে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অপরদিকে, সরকারি বিভিন্ন সংস্থাও রাসায়নিক আমদানির অনুমোদন দিয়ে সেটা কোথায় রাখা হচ্ছে, কীভাবে রাখা হচ্ছে এর খোঁজ রাখে না। অনুমোদন দিয়েই দায়িত্ব শেষ। কোনো সংস্থা আবার লাইসেন্স দেয়া বন্ধ রাখলেও অবৈধ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে নেয়া হয় না কোনো পদক্ষেপ।

এবিষয়ে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, সরকার ও সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো তাদের দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দারা সচেতন নন। ফলে সরানো যাচ্ছে না ক্যামিকেল গোডাউন। অনেক সুপারিশ বাস্তবায়ন হলেও কেমিক্যাল গোডাউন সরিয়ে নেয়ার সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি এখনো। এটা অবশ্যই করতে হবে। সরকার উদ্যোগ নিয়েছে এখন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য এটা নিজেদেরই সরিয়ে নিতে হবে।

২০১০ সালের জুন মাসে নিমতলীতে রাসায়নিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গোটা দেশ নেমে আসে শোকের ছায়া। মর্মান্তিক ওই দুর্ঘটনায় ১২৪ জন নিহত হয়েছিলেন। এই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে ৯ বছরের মাথায় ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার ওয়াহেদ ম্যানশনে ফের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ৭২ জন পুড়ে ছাই হয়ে যান। ওয়াহেদ ম্যানশনে কেমিক্যালের গোডাউন থাকায় অগ্নিকাণ্ডের পরপর নিমিষেই বেপরোয়া হয়ে ওঠে আগুন। গত বছরের ৫ নভেম্বর পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাটে একটি জুতার কারখানায় আগুন লেগে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়।

নিমতলীতে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকা থেকে প্রাণঘাতী রাসায়নিক পদার্থের কারখানা আর গুদামগুলো সরিয়ে নেয়ার দাবি উঠেছিলো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বেশকিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিলো, পরিকল্পিতভাবে রাসায়নিক শিল্পজোন গড়ে তুলে পুরান ঢাকার সব রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নেয়া এবং দাহ্য রাসায়নিক দ্রব্য আনা-নেয়া বন্ধসহ সেখানে নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা। এতো বছরেও এখনও সরেনি একটি কারখানাও। উলটো, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার সুযোগে অবৈধ রাসায়নিকের ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসা বাড়িয়েই চলেছেন দিনের পর দিন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) এক গবেষণায় উঠে এসেছে পুরান ঢাকায় রয়েছে ২৫ হাজার কেমিক্যাল গোডাউন। এসবের মধ্যে ১৫ হাজার আছে খোদ বাসা-বাড়িতে। মাত্র আড়াই হাজার গোডাউনকে ট্রেড লাইসেন্স দিয়েছে সিটি করপোরেশন। বাকি ২২ হাজারের মতো গোডাউন অবৈধ। এসব গোডাউনে ২০০ ধরনের ক্ষতিকর ও ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের ব্যবসা চলছে। পুরান ঢাকার এসব গোডাউনে রয়েছে গ্লিসারিন, সোডিয়াম অ্যানহাইড্রোস, সোডিয়াম থায়োসালফেট, হাইড্রোজেন পার অক্সাইড, মিথাইল-ইথাইল কাইটন, থিনার, আইসোপ্রোইলসসহ আরো অনেক ধরনের রাসায়নিক।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র বলছে, পুরান ঢাকার কেমিক্যাল গোডাউনের ৯৮ ভাগই অবৈধ। ২০১১ সালের ২০ এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বৈঠকে পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা ও গুদামগুলো কামরাঙ্গীচর ও কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এগুলো সরিয়ে নেয়ার জন্য পৃথক দুই জায়গায় ১৭টি ভবন তৈরি করা হচ্ছে।

এবিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছের বাংলাদেশ জার্নালকে বলেন, চকবাজারের চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল এলাকাগুলোতে ট্রেড লাইসেন্স দেয়া বন্ধ আছে। নতুন করে কাউকে কোনো ট্রেড লাইনেন্স দেয়া হবে না।

আগে যেগুলোর ট্রেড লাইসেন্স দেয়া ছিলো সেগুলোর ব্যপারে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যাদের আগে থেকেই দেয়া ছিলো তাদের লাইসেন্স নতুন করে নবায়ন করা হচ্ছে না। যারা এখনো ব্যবসা করে যাচ্ছেন তাদের বিষয়ে ক্যাবিনেট সিদ্বান্ত নেবে।

ভয়াবহ এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় অনেক সময় মামলা হয় না। যেসব ঘটনায় মামলা হয় তদন্ত শেষে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেয়া হলেও বিচার কার্যক্রম এখনো শেষ হতে বছরের পর বছর গড়িয়ে যায়। এর মধ্যে চকবাজারের চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি ঘটনায় মামলা হলেও তদন্ত কার্যক্রম শেষ হয়নি। আবার এসব মামলার আসামিরা গ্রেপ্তার হলেও বেশিরবাগ আসামিরা জামিনে বের হয়ে আসেন।

এবিষয়ে আইনজীবী দেয়ান সেতু বলেন, অগ্নিকাণ্ডের মামলায় দোষীদের যথাযথ সাজা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কারখানাগুলোয় আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, পুরান ঢাকা থেকে কারখানা সরানো না গেলে অগ্নিঝুঁকি থেকেই যাবে।

তিনি বলেন, পুরান ঢাকার এলাকাটি সব সময়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এলাকায় জনবসতির ঘনত্ব অনেক বেশি। সংকীর্ণ রাস্তা ধরে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে অনেক সমস্যা পোহাতে হয়। আশেপাশে পানির কোনও সোর্স নাই। পানি অপর্যাপ্ত। আশেপাশের বিল্ডিংগুলোর জন্য ঝুঁকির সৃষ্টি করে রেখেছে। আবাসিক এবং জনঘনত্বের কারণে এ এলাকা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হবে, যদি এ ধরনের কারখানা থাকে। এগুলো অপসারণে সিটি কর্পোরেশন কাজ করছে। এগুলো অপসারণ হলে অনেকাংশেই অগ্নি ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, পুরান ঢাকা থেকে কারখানা সরানো না গেলে অগ্নিঝুঁকি থেকেই যাবে।

তিনি বলেন, পুরান ঢাকার এলাকাটি সব সময়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এলাকায় জনবসতির ঘনত্ব অনেক বেশি। সংকীর্ণ রাস্তা ধরে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসতে অনেক সমস্যা পোহাতে হয়। আশেপাশে পানির কোনও সোর্স নাই। পানি অপর্যাপ্ত। আশেপাশের বিল্ডিংগুলোর জন্য ঝুঁকির সৃষ্টি করে রেখেছে। আবাসিক এবং জনঘনত্বের কারণে এ এলাকা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হবে, যদি এ ধরনের কারখানা থাকে। এগুলো অপসারণে সিটি কর্পোরেশন কাজ করছে। এগুলো অপসারণ হলে অনেকাংশেই অগ্নি ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।