মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ পেয়েও কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ শিবুর

সারাবাংলা

অনেক পরিশ্রম, মেধায় মেলে মেডিকেলে ভর্তির সুযোগ। অথচ সেই সুযোগ হাতের মুঠোয় এসেও যেন ফসকে যেতে চাইছে। হারিয়ে যেতে বসেছে ছাত্রজীবনের সবচেয়ে মধুর স্বপ্ন। যদিও শিবু রবি দাস বইয়ে পড়েছেন ‘অর্থই অনর্থের মূল’। আজ দরিদ্র পরিবারের মেধাবী এই সন্তানের স্বপ্নপূরণের জন্য এই অর্থই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

গাজীপুরে তাজউদ্দিন আহমদ মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন শিবু। এতে খুশি হওয়ার বদলে পরিবার ও তার কপালে পড়েছে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। মেডিকেল কলেজে ভর্তি- সে তো অনেক টাকা! ভর্তি হওয়ার পর পড়াশোনার খরচই-বা চলবে কীভাবে? সব কিছু মিলিয়ে তার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন অনিশ্চিত। কিন্তু মা বেলী রানী হাল ছেড়ে দিতে রাজি নন। তিনি ছেলের স্বপ্নপূরণে সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

শিবু রবি দাস গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের পাবুর গ্রামের মৃত যোগেশ রবি দাসের ছেলে। দুই ভাইয়ের মধ্যে শিবু ছোট। ছোটবেলা থেকেই সে পড়াশোনায় মনোযোগী। পরীক্ষার ফলেও রেখেছেন মেধার স্বাক্ষর। সর্বশেষ পরীক্ষায় গাজীপুর ভাওয়াল বদরে আলম কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। এরপরই বসেছেন মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায়। সেখানেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন।

কিন্তু বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে দারিদ্র্য। বেলী রানী রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আমি দরিদ্র মানুষ। শিবুর বাবা অকালে মারা যাওয়ার পর দুই ছেলেকে নিয়ে সমুদ্রে পড়ে যাই। অনেক সংগ্রাম ও দুঃখ-কষ্টের মধ্যে দিয়ে ওরা বড় হয়েছে। আমি মানুষের বাসা-বাড়িতে কাজ করি। আমার মাথার উপর ছায়া না থাকলেও দুই ছেলের মাথার উপর ছায়া হয়ে থাকার চেষ্টা করেছি।’

বর্তমানে গাজীপুর জেলা সদরে ছোট্ট একটি ভাড়া বাড়িতে ছেলেদের নিয়ে বাস করছেন বেলী রানী। জীবন সংগ্রামে এখনও তিনি অটল। কিন্তু সাধ আর সাধ্য মিলছে না কিছুতেই। অসহায় এই মা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘চিন্তা করে কূলকিনারা পাচ্ছি না- কীভাবে ছেলেকে ভর্তি করাবো? সবাই যদি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় তাহলে হয়তো তাদের কৃপায় আমার ছেলে দেশের মানুষের সেবা করার সুযোগ পাবে। না হলে আমার কোনো ক্ষমতা নেই ওর পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার।’

শিবু রবি দাসের বড় ভাই শিপন রবি দাস স্থানীয় কলেজের শিক্ষার্থী। ছোট ভাই মেডিকেলে পড়ার সুযোগ পাওয়ায় সে উচ্ছ্বসিত। কিন্তু পরিবারের অক্ষমতার কথাও তার অজানা নয়। শিপন বলেন, ‘মা আমাদের লেখাপড়া করাতে গিয়ে নিজে না খেয়ে থেকেছেন। ছোটবেলা থেকে আমাদের স্বপ্ন ছিল ভাই ডাক্তার হবে। এখন সে ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু অর্থের অভাবে ভর্তিটাই অনিশ্চিত হয়ে গেলো।’

ছাত্রজীবনে ভালো ফলাফলের পেছনে শিবু রবি দাস ভাকয়াদি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হালিম সরকারের অবদানের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘পরিবার, প্রতিবেশীদের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। কিন্তু সত্য এই যে, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সফল হলেও আমার সেখানে পড়ার সাধ্য নেই। জানি না ভর্তি হতে পারবো কিনা!’ শিবু সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষের কাছে সহযোগিতা কামনা করেছেন।

এদিকে পাবুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল মজিদ খানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশপাশের এলাকায় কোনো চিকিৎসক নেই। তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে কেউ মেডিকেলে চান্স পেয়েছে এখান থেকে শুনিনি। আমরা চাই শিবুর সাহায্যে সবাই এগিয়ে আসুক। একই কথা বলেছেন শিবুর স্কুলের প্রধান শিক্ষক হালিম সরকার। তিনি বলেন, পড়ালেখা শেষ করে শিবু ভালো চিকিৎসক হোক আমরাও এটা চাই।

কাপাসিয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাখাওয়াত হোসেন প্রধান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী না হওয়ায় শিবুর মা ছেলেকে নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন। আমি মনে করি দরিদ্র মেধাবী ছেলেটির পড়াশোনার দায়িত্ব সরকারের নেওয়া উচিত।’

এদিকে ‘অর্থনৈতিকভাবে অস্বচ্ছল’ শিক্ষার্থীদের সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছেন কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ. কে. এম গোলাম মোর্শেদ খান। টাকার অভাবে কোনো মেধাবী শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হবে না বলেও জানান তিনি।