‘ধান ডুইব্বা গেছে পুলাপাইন লইয়া না খাইয়া আছি’

সারাবাংলা

‘হঠাৎ কইরাই পানি ঘর ঢুইক্যা গেছে, কোনো কিছুর কুল কিনারা করতে পারি নাই। স্যার আমরা কষ্টে আছি। ঘরের চাঙের মইদে থাকতাছি। আট-দশজন পোলাফান লইয়া ভীষণ কষ্টের মধ্যে আছি। আমরার খাওন-দাওন নাই, গোলাত যা ধান আছিল সব ডুইব্বা গেছে।’ কোলে আড়াই বছরের শিশু নিয়ে এভাবেই আর্তনাদ করছিলেন রেখা বেগম। বৃদ্ধ স্বামী, দুই ছেলে, ছেলেদের বউ ও নাতি নাতনিদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এই বাড়িতে বসবাস করছেন তিনি।

করিমগঞ্জ উপজেলার গুণধর ইউনিয়নের দড়িগাংগাটিয়া গ্রাম। বন্যার শুরুর দিকেই ওই গ্রামে যাওয়ার উঁচু সড়কটি পানিতে তলিয়ে যায়। গ্রামটিতে যেতে এখন নৌকা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এই গ্রামের ৪০ শতাংশ বাড়িঘরে পানি উঠে গেছে। সেখানে কারো ঘরে হাঁটু পানি। কারো ঘরে কোমর পানি।

সরেজমিনে সোমবার (২০ জুন) বিকেলে নৌকা দিয়ে দড়িগাংগাটিয়া গ্রামে গেলে হঠাৎ চোখে পড়ল আধাডোবা দুচালা একটি টিনের ঘর। ছবি তুলতে গেলেই ভাঙ্গা টিনের ফাঁক দিয়ে গলা বাড়িয়ে দিলেন এক নারী। নৌকা দেখে তিনি আপ্লুত হয়ে বলতে লাগলেন, ‘ভাবছিলাম সরকারি লোকজনের কেউ ত্রাণ নিয়া আইছে। মুহূর্তের মধ্যেই মুখটি মলিন হয়ে গেল।’

আকস্মিক বন্যায় এই গ্রামের ঘরের খাটের উপর পর্যন্ত পানি উঠে গেছে। ঘরের ধান-চাল সব পানিতে তলিয়ে গেছে। হাঁস-মুরগি গরু-ছাগল কোথায় গেছে তা কারোরই জানা নেই। এসব এলাকার মানুষজন গত চারদিন ধরে শুধু মুড়ি আর পানি খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আর কোনো খাবার জুটছে না।

দড়িগাংগাটিয়ার পশ্চিমের গ্রামের নাম উরদিঘী। এই গ্রামের একটি পাড়া মরিচখালি। এই গ্রামের বাসিন্দা আরজুদা বেগম বলেন, আধা ঘণ্টার মধ্যে পানিতে ভেসে যায় ঘরের সব কিছু। একটি ঘটিও রক্ষা হয়নি তার। সন্তান-সন্ততিদের নিয়ে ভেজা কাপড়ে আশ্রয় নেন আরেকটি বাড়িতে।

তিনি আরো জানান, বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে গভীর নলকূপ। বিশুদ্ধ পানির জন্য হাহাকার চলছে।

গ্রামের মতিউর রহমান নামে অপর এক ব্যক্তি বলেন, ‘জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ কইরা আর পারতাছি না। খাওনের পানি নাই, ঘরে দানাপানি নাই। পরিবার পরিজন নিয়া অসহায় হইয়া পড়ছি। এখনো কেউ কোনো ত্রাণ নিয়ে আসেননি। সরকারের পক্ষ থেকে একবার কেউ খবরও নেয়নি। মুড়ি আর পানি খেয়ে সবাই বেঁচে আছি। এখনতো মুড়িও নেই।’

বোরো ধানের ওপরই নির্ভর করে হাওরের অর্থনৈতিক অবস্থা। আগাম বন্যায় দেশের বিভিন্ন হাওরে ব্যাপক ফসলহানি হয়। তবে কিশোরগঞ্জের হাওরে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি কমই হয়েছিল। এক লাখ চার হাজার হেক্টর জমিতে এবার আবাদ হয় বোরো ধানের। আগাম বন্যায় কয়েকশ’ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হলেও বাকি ধান তুলতে পেরেছিলেন কৃষকরা। ধান বিক্রির টাকায় বছরের খরচ চালানোর চেষ্টা ছিল তাদের। তবে কৃষকদের সংরক্ষণ করা ধানের গোলাও এখন পানির নিচে। আবার অনেক স্থানে গলা ছুঁই ছুঁই করছে পানি। এ অবস্থায় কৃষকের মাথায় হাত। অনেকে নৌকায় করে ধান নিয়ে নামমাত্র দামে বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার অনেকে ধান হারিয়ে এখন অসহায় হয়ে পড়েছেন।

কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মতিউর রহমান জানান, জেলার কালনী কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ১৪৮ সেন্টিমিটার এবং ধনু বৌলাই নদীর পানি বিপদসীমার ৬৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে অবস্থার আরো অবনতি হতে পারে।

কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত পাঁচ হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছে। তবে অনেক মানুষ এখনো সহায়-সম্বল বাঁচাতে দুর্যোগের মধ্যে বাড়িতে রয়ে গেছেন। গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি বা ঘরের আসবাব রেখে যেতে চাইছেন না তারা।