বাঁচার তাগিদে কচি হাতে শক্ত বৈঠা, তবু লেখাপড়া ছাড়েনি সংগ্রামী মুনিরা

Slider right সারাবাংলা

বয়স বড়জোড় ১২ পেরিয়েছে। বাবা অন্ধ, তাই সংসারের পুরো দায়িত্ব তার কাঁধে। এই শিশু বয়সে বাঁচার তাগিদে তাকে নরম হাতে ধরতে হয়েছে শক্ত বৈঠা। আরো সহজ করে বলতে গেলে, খেয়া পারাপারেই তার জীবিকার প্রধান উৎস। মা থেকেও নেই। যখন তার বয়স বছর দেড়েক, তখন মা ঘর ছেড়েছেন। মা কোথায় আছেন, কেমন আছেন জানে না সে। মায়ের কথা উঠলেই শুধু তার চোখ গড়িয়ে নোনাজল কপোলে পড়ে। বয়স যখন তার পাঁচ বছর ছুঁই ছুঁই, তখনই সংসারের কাজে কচি হাত বাড়িয়েছে। কারণ সে-ই পরিবারের একমাত্র সন্তান।

এ বয়সে সংসারের উপার্জন থেকে গৃহস্থের কাজ সামলাতে গিয়ে পড়ালেখার বারোটা বাজারই কথা। কিন্তু তা ঘটেনি, ১২ বছর বয়সে সে প্রাইমারি পেরিয়ে মাধ্যমিকে পা রেখেছে। তাও যেনতেনভাবে নয়, পড়ালেখায়ও সে খুব ভালো। বাসায় থাকা তো দূরের কথা, পড়ার মতো পরিবেশ নেই। নেই কোনো টেবিল কিংবা চেয়ার। তাই স্কুল, ঘরের কাজ আর নৌকা পারাপারের পর মনোযোগ দেয় বইয়ে। ইচ্ছে, পড়ালেখার পাট চুকিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ। এভাবেই একদিন দাঁড়াবে পরিবার আর সমাজের পাশে নিজের পরিচয়ে।

নরম হাতে শক্ত কাঠের বৈঠা বেয়ে নদীর সঙ্গে জীবনের সংগ্রাম করা এই মেয়েটির নাম হাফসা আকতার মুনিরা। পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার চরবাসরী গ্রামের বাসিন্দা মনির হোসেনের একমাত্র মেয়ে মুনিরা। উপজেলা সদর থেকে সামান্য পূর্ব দিকে সন্ধ্যা নদী থেকে উঠে আসা চিড়াপাড়া খালের খেয়াঘাট। এই ঘাটেই খেয়া পারাপার করে মুনিরা। বাবা বাক ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী। মুনিরার বয়স যখন মাত্র দেড় বছর, তখনই তার মা সংসার ছেড়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর বাবা মনির হোসেন ও ফুফু রোজিনা বেগমের আদর-স্নেহে বড় হয়ে ওঠে মুনিরা।

মুনিরার অন্য মেয়েদের মতো সহপাঠীদের সঙ্গে গল্প, আড্ডা আর পড়াশোনায় মগ্ন থাকার কথা। ঠিক সেই বয়সে তার হাতে তুলে নিতে হয়েছে বৈঠা। দরিদ্র বাবার একমাত্র মেয়ে মুনিরার জীবনের গল্পটা সত্যিই বড় কষ্টের, বড় বেদনার। অভাব আর দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হওয়া ১২ বছরের মুনিরার কাঁধে এখন সংসারের বোঝা। বাবা অসুস্থ বলে কেউ তাকে কাজে নেয় না। ফলে সংসার টিকিয়ে রাখার সংগ্রামটা একারই করতে হচ্ছে মুনিরাকে।

খেয়া পারাপার দিয়ে সকালটা শুরু। খেয়া পারাপারের পাশেই কাউখালী আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সেখানে সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে সে। সকালে খেয়া পারাপারের পর বই খাতা নিয়ে স্কুলে যায় মুনিরা। ক্লাস শেষে দুপুরে বাসায় ফিরে এসে মনোযোগ দিতে হয় সংসারের কাজে। রান্না থেকে শুরু করে সংসারের কাজ সামলায় নিজ হাতে। বেশ মেধাবী মুনিরা।

মুনিরার স্কুলের সময়টায় খেয়া পারাপার করেন তার বাবা মনির হোসেন। দুপুরে স্কুল থেকে এসে রান্নাবান্নাসহ আনুষঙ্গিক সব কাজ শেষে আবার বৈঠা হাতে নৌকায় উঠতে হয় মুনিরাকে। সন্ধ্যা পর্যন্ত যাত্রী পারাপার করে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০ টাকার বেশি আয় হয় না। এই আয়ের একটা অংশ পড়ার পেছনে ব্যয় করে বাকিটা সংসারের জন্য রেখে দেয় মুনিরা। দিনে সময় কোথায়, তাই রাতেই চলে পড়ালেখা।

মুনিরা যে নৌকায় যাত্রী পারাপার করে সেই নৌকাটিও ভাঙাচোরা। এতে বড়জোর দুই থেকে চারজন যাত্রী একসঙ্গে পার হতে পারে। নৌকার তলদেশে একাধিক ছিদ্র থাকায় পানি ওঠে। এ জন্য কাদামাটি দিয়ে ছিদ্রগুলো বন্ধ রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করছে মুনিরা। নতুন করে যে একটা নৌকা কিনবে সেই অবস্থাও নেই। যাত্রীপ্রতি পাঁচ টাকা করে যে আয় হয় সেই টাকায় সংসার আবার লেখাপড়া এরপর আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। ফলে এই ভাঙাচোরা নৌকা আর বৈঠা নিয়ে নদীর সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে হয় মুনিরাকে।

নৌকার চেয়েও মুনিরার থাকার ঘরের অবস্থা আরো শোচনীয়। জীর্ণ কুটিরে একটি ভাঙাচোরা চৌকি ছাড়া আর কিছুই নেই। পড়াশোনা করার মতো একটি টেবিল পর্যন্ত নেই ঘরে। মাটির ঘরে বস্তা কিংবা হোগলা বিছিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছে। কারো কাছে প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য নেই। শ্রেণিকক্ষের পাঠদানই মুনিরার সামনে এগিয়ে যাওয়ার একমাত্র ভরসা।

মায়ের প্রসঙ্গ উঠতেই হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে মুনিরা। মায়ের ভালোবাসা কী তা জানে না সে। মায়ের মুখটাও মনে নেই। দিনে শত ব্যস্ততার মধ্যে মায়ের কথা মনে পড়ে না। তবে রাতে যখন ঘুমাতে যায়, তখন মায়ের কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে। সব সময় মাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করে সে। কিন্তু কেউ যখন তার মায়ের প্রসঙ্গ তোলে তখন তার খুবই কষ্ট হয়। ছোটবেলা থেকে মায়ের আদর-স্নেহহীন হয়ে বেড়ে ওঠা মুনিরার বেশি চাওয়া-পাওয়ার নেই। পড়াশোনা শেষে একটি চাকরি করে যেন তার বাবাকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে এটাই প্রত্যাশা মেয়েটার।

মুনিরা বলে, ‘খেয়া পারাপার মেয়েদের কাজ না। কিন্তু বাবারে কেউ কাজে নেয় না। আমিও তেমন কোনো কাজ জানি না। বাবার একটা ভাঙাচোড়া নৌকা আছে। সেটি দিয়ে খেয়া পারাপার করে সংসার চলে। খেয়া পারাপারের কাজ করায় অনেকে বাঁকা চোখে দেখে। অনেকে বলে, নৌকা ছাড়, নয়তো বিয়ে হবে না। নৌকা ছাড়লে কী খাব! আমার স্বপ্ন, লেখাপড়া শেষ করে বড় হয়ে চাকরি করব। বাবাকে নিয়ে ভালোভাবে থাকব। ‘

মুনিরার ফুফু রোজিনা বেগম জালেন, সংসারে তারও একটি মেয়ে আছে। তার পরিবারেও সারা বছর লেগে থাকে অভাব-অনটন। এর মধ্যেও নিজ সন্তানের মতো মাতৃস্নেহে বড় করেছেন মুনিরাকে। কখনো মায়ের কষ্ট বুঝতে দেননি। কিন্তু সাধ অনেক থাকলেও সাধ্যের অভাবে কিছুই করার নেই রোজিনার।

মুনিরার বাবা মনির হোসেন বলেন, ‘আমি প্রতিবন্ধী। কাজ করতে পারি না। তাই আমাকে কেউ কজে নেয় না। মুনিরা যখন স্কুলে যায়, তখন যাত্রীর চাপ কম থাকে। ওই সময়টায় আমি খেয়া দিই। খেয়া পারাপার করেই সংসার আর মেয়ের পড়ালেখা কোনোমতে চলে। ‘ বিকল্প কোনো ব্যবস্থা না থাকায় মেয়েকে দিয়ে তিনি ছেলেদের কাজটি করাচ্ছেন। তাতে করে বাবা হিসেবে তার কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু খেয়া ছাড়া তাদের আর কী করার আছে।

কাউখালীর পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে নিয়ে কাজ করছেন সমাজসেবক আব্দুল লতিফ খসরু। আশ্রয়ণের শিশুদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করতে গিয়ে তার নজরে আসে মুনিরা। খসরু জানালেন মুনিরার জীবনসংগ্রামের গল্প। মুনিরার সব দুঃখ-কষ্টের ভাগ নিতে সাধ্যমতো বাড়িয়েছেন সহযোগিতার হাত। স্কুলের ড্রেস কেনা থেকে শুরু করে মুনিরাকে প্রায়ই সহযোগিতা করছেন আব্দুল লতিফ। সমাজের বিত্তবানদের পাশাপাশি মুনিরার প্রতি সরকারের দৃষ্টি প্রসারিত হবে―এমনটাই প্রত্যাশা এই সমাজসেবকের।

কাউখালী সদর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আশরাফুল ইসলাম বলেন, মুনিরার দাদা ভূমিহীন হিসেবে খাসজমি পেয়েছিলেন। সেই জমিতে একটি ঝুপড়ি ঘরে বাবা-মেয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। মুনিরার বাবা প্রতিবন্ধী। কাজ করতে পারেন না। তাই মেয়ে আর বাবা পালা করে খেয়া পারাপারের কাজ করেন। তা দিয়ে যা আয় হয়, তাতের মুনিরার পড়ালেখা আর সংসার টেনেটুনে চলে।

কাউখালী আদর্শ নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাইনুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, হফসা আকতার মুনিরা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। মেধা ভালোই। মাঝামাঝি পর্যায়ের শিক্ষার্থী। খেয়া পারাপার করে সংসার চলে। স্কুল কর্তৃপক্ষ তার পাশে সহযোগিতা করে আসছে। শিশু মুনিরা উপার্জনের পাশাপাশি সংসারের কাজ করায় প্রতিদিন স্কুলে আসতে পারে না।