কাঠের উপর ফুল ফুটিয়ে স্বাবলম্বী নবাবগঞ্জের দারুশিল্পীরা

Slider right

প্রাচীনকালে বা কয়েক শতাব্দী পূর্বেও মূল্যবান কাঠের প্রাপ্যতার সংখ্যা ছিল কম। দারুশিল্পের কাজে-কর্মে রাজা বাদশা তথা নৃপতিদের যথেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ছিল। তখন দারুশিল্পীদের কোনোরূপ আর্থিক দৈন্যতা ছিল না। অধ্যাবসায়, একাগ্রতা ও সৃষ্টিশীল মনোরম দারুশিল্প অনায়াসে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনে সক্ষমতা লাভ করেছিল। পরবর্তীতে এসবের অনুপস্থিতিতে কিংবা উপযুক্ততা বিহনে দারুশিল্প লুপ্ততার আশ্রয় নিয়েছে। তবুও এ দেশের গ্রামে গঞ্জের দারুশিল্পীরা তাদের বংশ পরস্পরায় স্বভাবসিদ্ধ কলাকৌশল কিছুটা হলেও পৈতৃক পেশা কোনরকমে টিকে রেখেছেন।

জানা গেছে, দারুশিল্পের শিল্পীরা মূলত ছিল সূত্রধর সম্প্রদায়ের। সুতো ধরে মাপজোপ করে কাজ করতো বলেই সামাজিক সম্প্রদায়ের নাম সূত্রধর। ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলায় কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের সূত্রধরের লোকজন কাঠের অর্থাৎ দারুশিল্প কর্মের সাথে জড়িত। কেউ কেউ বাপ দাদার আদি পেশা ছাড়লেও। গুটি কয়েক পরিবার এখনো বাপ দাদার পেশাকেই আঁকড়ে ধরে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। অবনতি ঘটেছে সৃষ্টিশীল চিন্তা-চেতনার, হারিয়েছে দক্ষতা-অভিজ্ঞতা কিংবা সৃজনশীল মনোভাব। সময়ের সাথে আধুনিকতার ছোয়াও লেগেছে এ শিল্পে তবে চাহিদা কমেনি। বরং আধুনিকতার ছোঁয়াতেও দারুশিল্পীরা তাদের পেশাতে আগের মতোই কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

মনের মাধুরী মিশিয়ে দারুশিল্পীরা শুকনো কাঠের উপরে খোদাই করে ফুল বানান। আর এই ফুল ফোটানোর মধ্য দিয়ে চলে দারুশিল্পীদের জীবন সংসার। খুব ছোটবেলা থেকেই একজন নকশা শিল্পী এমন শৈল্পিক কাজের সাথে জড়িত থেকে নকশা করার কলাকৌশল শিখেন। কাঠকে পুঁজি করে বিভিন্ন রকমের নকশা তৈরি করতে হয় তাদের। প্রত্যাহিক জীবনে ব্যবহৃত খাট-পালঙ্ক, শোভা আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, কাঠের সিঁড়ি, শো-কেচসহ গৃহের আসবাবপত্র এবং কাঠের খুটির মধ্যে খোদাই করে নকশার ব্যবহার দেখা যায়। গ্রামবাংলার এসব নকশা শিল্পীরা দেশের সাথে বিদেশী নকশার সম্মিলন ঘটিয়েছে। এতে নতুন আসবাবপত্রে নকশার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলায় বাজারে বাজারে ফার্নিচারের দোকান গড়ে উঠেছে। আর এতেই অনেকের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। কাঠের উপর নকশা করে চলছে সংসার। কেউ কাঠ দিয়ে বিভিন্ন আসবাবপত্র তৈরি করছেন। প্লাস্টিকের পন্য বাজার দখলে থাকলেও কাঠের ফার্নিচারের চাহিদা কমেনি। তাই অনেকেই নকশা তৈরি করে জীবিকাও নির্বাহ করছে। কাঠের তৈরি জিনিসপত্রের সৌন্দর্য্যের কারনে আজও নতুন নতুন কাঠের ফার্নিচারের চাহিদা বাড়ছে। সেভাবে চাহিদা বাড়েনি নকশা শিল্পীদের।

উপজেলার বান্দুরা ইউনিয়নের নতুন বান্দুরা গ্রামের নকশা কারিগর দিপঙ্কর মণি দাস। অভাবের সংসারে খুব ছোটবেলা থেকে নকশার কাজের সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১০ বছর ধরে নকশার কাজ করে পরিবারের ৫ সদস্য নিয়ে চলে সংসার। জীবিকার তাগিদে নকশা করাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন দিপঙ্কও মনি দাস। তার মতো অনেকেই কাঠের উপর ফুল করে জীবিকা নির্বাহ করছেন।

উপজেলার বান্দুরা, বারুয়াখালী, শিকারীপাড়া, জয়কৃষ্ণপুর সহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, নতুন নতুন ফার্নিচারের দোকান গড়ে উঠেছে। এতে নকশা শিল্পীদের চাহিদা তেমন বাড়েনি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় নকশায় এসেছে পরিবর্তন। বিভিন্ন রকমের নকশা তৈরি হচ্ছে অত্যাধুনিক মেশিনের সাহায্যে। জানা গেছে, নকশার কাজ ভালো ভাবে আয়ত্ত করতে একজন নকশার মিস্ত্রির ৫-৬ বছর লাগে। একজন নকশা মিস্ত্রি পরিপূর্ণ হওয়ার পর বেতন পান ১৮-১৯ হাজার টাকা। আর অর্ধেক মিস্ত্রিরা বেতন পায় ৮-৯ হাজার টাকায়। তবে নকশার কাজেও আধুনিকতার ছোঁয়ায় বদলে গেছে নকশা। আর সেই সাথে নকশারও পরিবর্তন ঘটেছে।